মরিচ গাছের পাতা কোকড়ানো রোগের ঔষধ

remedy for chilli leaf blight

মরিচ গাছের পাতা কোকড়ানো রোগের ঔষধ জানতে গেলে আগে বুঝতে হবে যে আসলে রোগটি ভাইরাস আক্রমনে নাকি মাকরসা আক্রমনের নাকি থ্রিপস এর ফলে হয়েছে। কারণ ভাইরাস আক্রমনে হয়ে থাকলে গাছটি তুলে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হয় বা বাগান থেকে দুরে নিয়ে পুতে দিতে হয়। আর যুদি মাকরসার আক্রমনে হয়ে থাকে তবে এটি বিভিন্ন পদ্বতিতে সারিয়ে ফেলা যায়।

মরিচ বাংঙ্গালিদের জন্য এমন একটি খাবার সহকারি উপকরণ যা ছারা বাঙ্গালি তাদের কোনো খাবারই কল্পনা করতে পারে না। সবজি, সালাদ, তরকারি যে প্রকার খাবারই তারা তৈরি করুক না কেন তারা খাবারের সাথে মরিচ রাখবেই। এমনটি বাঙ্গালিরার মরিচের আচারও দিয়ে রাখে।

আর তাছারা বাংলাদেশে মরিচের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক। আর এ ছারাও মরিচে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সিসহ আর পুষ্টি উপাদান।
তবে মরিচ গাছের নানা প্রকার রোগের কারনে মরিচ চাষিরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার স্বিকার হয়ে থাকে।

যেমন গাছ ঢলে পড়া বা গোড়া ও মূল পচা, আগা মরা বা ফল পচা, অলটারনারিয়া ফল পচা, চুয়ানিফোরা পাতা পচা, সারকোস্পোরা পাতায় দাগ, ব্যাক্টেরিয়া জনিত ফল পচা, পাতা কোকরানো রোগ আরও অনেক।

এ মরিচ গাছের রোগ গুলোর মধ্যে একটি খুবি ভয়ানক একটি রোগ হলো মরিচ গাছেল পাতা কোকরানো রোগ। আর এ রোগটি এতটাই ভয়ানক হয় যে এটি একটি মরিচ গাছকে মেরেও ফেলতে পারে। তবে এ রোগের কারণ এর আক্রমণকারিদের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। আর এই অণুসারে এ রোগের দমন প্রক্রিয়াও ভিন্ন ধরনে হয়ে থাকে।

মরিচ গাছের পাতা কোকরানোর ধরণ এর উপর ভিত্তি করে এর আক্রমণকারিকে সনাক্ত করা হয়। যুদি পাতা নিচের দিকে কোকরে যায় অথাৎ নৈকার বিপরিত দিকে কোরে যায় তবে বুঝতে হবে এটি হয়েছে মাকরসার আক্রমনে।

আর যুদি পাতা উপরের দিকে কোকরে যায় বা নৈকার দিকে কোকরে যায় তবে বুঝে নিতে হবে এটি ভাইরাস এর আক্রমনে হয়েছে। আর এছারাও থ্রিপস যেটি এক প্রকার চোষি পোকা এদের আক্রমনেও মরিচ গাচের পাতা উপরের দিকে কোকরে যায়। তবে থ্রিপস এর প্রতিয়েধক বিদ্যমান আছে। কিন্তু ভাইরাস আক্রমনের ফলে প্রতিষেধক বিদ্যমান নেই।

মরিচ গাছের পাতা কোকড়ানো রোগের ঔষধ

আর এরুপ অবস্থায় আপনার বাগানের বাকি গাছগুলোও এ রোগের আক্রমনের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে আর তাই বাগানের বাকি গাছগুলোকে বাচাঁতে হলে আপনাকে আক্রান্ত গাছটিকে তুলে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা দুরে নিয়ে ফেলতে হবে।

তবে এর প্রতিষেদক না থাকলেও এটি যুদি শুরুর দিকে পূর্নাঙ্গভাবে পরিচর্যা করা যায় তবে এ ভাইরাসের আক্রমণ থেকে মরিচ গাছ রক্ষা করা সম্ভব।

লিফ কার্ল এর প্রভাবে গাছের অবস্থা

  • গাছের পাতার আকৃতি বিকূত হয়ে যায়।
  • গাছের পাতার নিচে পোকার আক্রমনে দাগ হয়ে যেতে দেখা যায়।
  • গাছের বৃদ্ধি আটকে যায়।
  • ফলন কমে যায়।
  • ফল আসা বন্ধ হয়ে যায়।
  • গাছ দুর্বল হয়ে যায়।
  • পাতার মধ্যশিরায় আশে পাশে বাদামী হয়ে যায়।
  • বাগানের অন্য মরিচ গাছগুলোকেও আক্রান্ত করে।

মরিচ গাছের পাতা কোকড়ানো রোগ দমন

এখন পযন্ত মরিচগাছের ৬৫টি টি রোগের দেখা পাওয়া গেছে। আর এ ৬৫টি রোগের মধ্যে একটি হলো লিফ কার্ল রোগ বা মরিচ গাচের পাতা কোকরানো রোগ। লিফ কার্ল রোগ তিন ধরনের হয়ে থাকে একটি হলো ভাইরাস আক্রমনে অপরটি হলো মাকরসার আক্রমনে এবং অন্যটি হয়ে থাকে থ্রিপস এর আক্রমনে। আক্রমনের ধরন এর উপর ভিত্তি করে এ রোগের প্রতিকারাও পরিবর্তি হয়ে থাকে।

এখানে ক্রমে ক্রমে কোন রোগের ধরণ কেমন আর কোনধরনের পোকার আক্রমনে কেমন প্রতিষেধক প্রয়োগ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে তার সম্পর্কে লেখা হলো।

ভাইরাস আক্রমনের ফলে পাতা কোকরানো রোগ

যেটি ভাইরাস আক্রমনে হয়ে থাকে সেটির এখন পযন্ত কোনো প্রতিষেধক তৈরি করা হয়ে উঠেনি তবে গবেষণায় দেখা গেছে এ ভাইরাসটি বহন করে একধরনের সাদা মাছি।

এ ভাইরাস বহনকারি মাছির মরিচ গাছ ছারও আরও অন্য সকল গাছে আক্রমন প্রায় সবসময়ই দেখা যায়। তবে এ মাছির আক্রমন তীব্র হয় সুকনো মৈসুমে।

আর বিষেশজ্ঞদের মতে যুদি এই সাদা মাছি দমন করা যায় তবে দমন করা যাবে এভাইরাস। এ সাদামাছি দমনে অনেকে অনেক রকম প্রতিষেধক তরল প্রয়োগ করে থাকে চাষের জমিতে এবং অনেকগুলোতে ভালো ফলাফলও পায়।

কৃষিবীদদের মতে এমিডা গ্রুপের পেস্টিসাইড ব্যবহার করার মাধ্যমে দমন করার সম্ভব এ পাতা কোকরানো রোগ। যদি জৈবিক ভাবে এ রোগ দমন করতে চান তবে নীমতেল বৈকালে গাছে স্প্রে করতে হবে। এছারাও বিভিন্ন কৃটনাশক এর দোকানে এখন অনেক ধরনের প্রতিষেধক পাওয়া যায়।

মাকড়সার আক্রমনে পাতা কোকরানো রোগ

মাকড়সার আক্রমনে পাতা কোকরানো রোগ মূলত দুই রকমের হয়ে থাকে। এটি দেখা যায় কোন ধরনের মাকরসা আক্রমন করল তার উপর। কারণ দুধরনের মাকড়সা মরিচগাছেল লিফ কার্ল রোগের জন্য দ্বায়ি আর এরা হলো লাল মাকড় এবং হলুদ মাকড়।

  1. হলুদ মাকড় এর আক্রমন
    • হলুদ মাকড়ের আক্রমনে ফলে গাছেল কচি পাতাগুলো কোকরে যেতে দেখা যায়। তবে পাপ্তবয়স্ক পাতাগুলোর তেমন কোনো ক্ষতি হতে দেখা যায় না।
  2. লাল মাকড় এর আক্রমন
    • লাল মাকড়ের আক্রমনে গাছের পরিপূর্ণ থেকে শুরু করে কচি সকল পাতাই আক্রান্ত হয়।

এফিড বা জাব পোকার আক্রমনে পাতা কোকরানো রোগ

এফিড বা জাব পোকা পোকা যা এক প্রকার চোষী পোকা। এ পোকাগুলো মরিচ গাছের কচি পাতার এমনটি কান্ডেরও রস চোষে খেয়ে নেয় যার কারণে গাছ অনেক বেশী দুর্বল হয়ে যায়। আর ফলন তুলনামূলক ভাবে কমে যায়। এ পোকার আক্রমনে মরিচ গাছের পাতা উপরের দিকে কোকরে যায় যা অনেকটা ভাইরাস আক্রমনের মতো দেখায়।

ভাইরাস আক্রমনের ফলে পাতা কোকরানো রোগ প্রতিষেধক

সাদা মাছির বৈজ্ঞানিক নাম হলো Aleyrodidae

white-fly-Aleyrodidae

সাদামাছি নামক একপ্রকার প্রজাতির মাছি এ রোগের জন্য দ্বায়ি ভাইরাস বহন করে থাকে। আর যেহেতু ভাইরাস এর প্রতিয়েধক বা ভাইরাস দমনের আজ পযন্ত কোনো ঔষধ তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠৈনি তাই এ রোগ থেকে গাছ বাচাতে হলে অবশ্যই এ ভাইরাসের বাহককে দমন করতে হবে। আর তাই সাদামাছি দমনের জন্য বেশ কিছু রাসায়নিক কৃটনাশক দ্রব্য রয়েছে।

তবে এখানে আমি আমার জানা থাকা কিছু রাসায়নিক প্রতিষেধক আপনাদের সামতে তুলে ধরলাম:

  • ইমিডাক্লোপ্রিড ১৮.৭% এস এল ১মিলি/৫লিটার
  • ফেনভেলারেট ২০%ই. সি ০.৫মিলি/লিটার
  • ফ্লোনিকামিড ৫০%ডবলু. জি ১গ্রাম/৫লিটার
  • ল্যাম্বডা সাইহ্যালোথ্রিন ৫% ই.সি ০.৫ মিলি/লিটার
  • আক্রমণ এর মাত্রা অধিক হলে ম্যালাথিয়ন ৫৭ইসি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে

এছারাও প্রতিষেধক তরল প্রয়োগ করা ছারাও আরও কিছু পরিচর্যা আছে যা করাটা খুবি দরকারি আর এগুলো হলো:

  • ভালো প্রতিরোধি জাত চাষ করা।
  • বাগান পরিষ্কার রাখা।
  • আগাছা বেড়ে গেলে তা নিয়ম মাফিক পরিষ্কার করা।
  • আক্রান্ত গাছের সংখ্যা খুবি কম হলে সেগুলো তুলে নিয়ে পুতে দেওয়া বা নিষ্বেষ করে দেওয়া।
  • ২:১ অনুপাতে ডিটারজেন্ট পানি মিশ্রণ তৈরি করে বাগানে ব্যাবহার করা বা স্প্রে করা।
  • নিম তেল স্প্রে করা।

মাকড়সার আক্রমনে পাতা কোকরানো রোগ প্রতিষেধক

লাল মাকড়ের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Etranychus.

red spider mite etranychus

মাকড়ের আক্রমন সেটা লাল মাকড় বা হলুদ মাকড়ই হোকনা কেন এদের প্রতিষেধক একই রকমের হয়ে থাকে। এ মাকরগুলো এতটাই ছোট যে এদের খালি চোখে দেখা যায় না, তবে এগুলো ম্যাগনিফাইন গ্লাস এর সাহায্যে দেখা সম্ভব।

আরো পড়ুন : সরিষা চাষ পদ্ধতি জানুন সম্পূর্ণ ভাবে

এদের কারণে মরিচ গাছের মরিচের উৎপাদন অনেকআংশেই কমে যায়। এরা সাধারণত পাতার নিচের দিকে অবস্থান করে থাকে আর পাতার রস চুসে খায়। আর গাছের ক্ষাতি সাধন করে থাকে। একটু ভালো পরিচর্যা আর প্রয়োজন মোতাবেক পতিষেধক তরল স্প্রে করলে এ মাকড় গুলোর ক্ষতি থেকে মরিচ গাছ রক্ষা করা খুবি সহজ।

  • ১ লিটার পানিতে সালফার জাতীয় কীটনাশক ৫ গ্রাম মিশিয়ে সূর্য ডোবার পর স্প্রে করতে হবে। নিয়ম মাফিক ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
  • নিমতেল স্প্রে করতে হবে।
  • মরিচ গাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নিয়ম মাফিক ১৫ দিন পর পর প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে সূর্য ডোবার পর গাছে স্প্রে করতে হবে।
  • আক্রমনের পরিমান বেশী হলে ওমাইট ৫৭ ইসি প্রতিলিটার পানিতে ২ মিলি বা ভার্টিমেক ১.৮ ইসি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি মিশিয়ে পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করে মাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অবশ্যই সকল প্রকার কীটনাশক প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আর পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক ব্যাবহার করার যাবে না আর মাকড় ছারাও অন্য পোকার আক্রমন লক্ষিত হলে আগে মাকরের প্রতিষেধক এবং তার পর অন্য সকল পোকার প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে হবে।

এফিড বা জাব পোকার আক্রমনে পাতা কোকরানো রোগ প্রতিষেধক

এফিড বা জাব পোকার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Aphidoidea

aphid-aphidoidea

মাকড়ের মতো এরাও পাতার নিচে বসবাস করে আর এর গাছের কান্ডেও আক্রমন করে থাকে। তবে এদের দমন করাটা অনেকটা মাকড়ের দমনের মতোই। এরা আকারে খুবি ছোট হয়। এর বিভিন্ন রং এর হয়ে থাকে তবে এরা একই ভাবে আক্রমণ করে থাকে সুধূ এদের কয়েকটা প্রজাতিতে ভিন্নতা দেখা যায়।

জাব পোকা যেখানেই আক্রমণ করে দলবদ্বভাবে আক্রমন করে। আর এদের দলবদ্বভাবে আক্রমনের ফলেই গাছের বিশাল ক্ষতি এরা করতে সক্ষম। আর এরা এতটাই ভয়াবয় হয়ে দাড়ায় যুদি এদের সময়মতো দমন না করা হয় যে একটি গাছকে এরা রস চোষে মেরেও ফেলতে পারে।

জৈবিক ভাবে জাব পোকা দমণ

  • ছাই ছিটিয়ে,
  • গুল ৫ গ্রাম / প্রতি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে।
  • সাবান এর গুরা ৪ গ্রাম / প্রতি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে।

রাসায়নিকভাবে জাব পোকা দমণ দমন

  • ইমিডাক্লোপ্রিড (০.৫মিলি / লিটার )
  • ডাইমেথয়েট (২ মিলি / লিটার )
  • এসিফেট (১ গ্রাম / লিটার )
  • আসিট্মিপ্রিড (১ গ্রাম / লিটার )

জৈবিক ভাবে এবং রাসায়নিক ভাবে আপনারা বিভিন্ন ভাবে এ পোকাগুলোকে দমন করার মাধ্যমে আপনার বাগানের সবজির সঠিক স্বাস্থ নিশ্চিত করতে পারবেন। আর তাছার আরও বিভিন্ন ধরনের ঘরোয়া পদ্বতি আছে এ পোকাগুলো দমন করে ভালো ফসল পাওয়ার।

তবে যত ভালো পদ্বতিই ব্যবহার করুন না কেন আপনাকে অবশ্যই আপনার বাগানের ভালো ভাবে পরিচর্যা করতে হবে। বাগানে নিয়মিন সার প্রয়োগ প্রয়োজন অনুসারে কীটনাশক প্রয়োগ আগাছার পরিষ্কার করা মাটি আগলা করে দেওয়া এসকল দিলেই আপনার লক্ষ রাখতে হবে একটি ভালো ফলনের জন্য

No Comments

Leave a Reply

Categories

Featured